Monday, 5 October 2020

রমা

 রমা 

আমার বয়স ৩০। গত ৩০ বছরে ৪টা বড় বড় Certificate আছে আমার । আমার অনেক বড় পাওয়া আমার ছাত্র জীবনে রমা মেম কে পাওয়া। ক্লাস ৪ থেকে তিনি আমাদের স্কুলে আমাদের পড়িয়েছেন দশম ক্লাস পর্যন্ত । ক্লাস ৪ থাকতেই খুব সহজে মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন টেন্স । প্রথম দিন ৪ তা রুল এমন করে ৩ দিনে পুরো টেন্স মাথার ভিতর । হটাত হটাত করে বলবে এই রুলস তা লিখে দাও না হলে ৫ মার্ক্স কাটা । ছোট মাথায় ডুকিয়ে দিলেন প্রথম ভালবাসার মত টেন্স কে ।  উনি আমাদের ধর্ম স্যার না  আসলে ক্লাস নিতেন , প্রতি জন পরে পরে বুজাবে সে কি বুজছে ! ক্লাসে পড়া খতম । ক্লাসে পিন পন নিরবতা থাকতো মেম এর ক্লাসে কারন কে যে কখন ধরা খাবে এর মুরগী বানাবে তাই আগে থেকে পড়া ও মন যোগ এক সাথে দিতে হত । আমাদের তখন ই শিখিয়েছেন শৃঙ্খলা , একসাথে চলা , ন্যায় , অন্যায় ,আবে্‌ ধর্ম ,সামাজিকতা , আর নিজেকে জানা । প্রতিদিন ভাবতাম মেম বুজি আজ ময়মন্সিং নিয়ে কথা বলবে ! যেখানে গল্প গুলার ভিতর থাকতো রাজা রানী অলৌকিক কাহিনী অথবা কি কি দারুণ সব জায়গা আছে ওখানে । আমরা ছোট বেলাতেই ভেবে রেখেছি যাব তো যাব ওই ময়মন্সিং । 

আমরা ক্লাস ৫ এ উঠলাম , মেম বদলে গেলেন । চরম হার্ড লাইন । এইবার তোদের কিছু করতেই হবে । ক্লাস শেষে আবার কোচিং । এর আন্সার এই ভাবে দিবে । অটাকে ঘুরিয়ে দিলে এই আন্সার । কত পরিশ্রম যে করত আমাদের পিছনে । তোমার আন্সার এত খারাপ হল কেন ? ভাষা টা ঘুরিয়ে বললে কত সুন্দর হত আন্সার । মেম একটা শিট লিখেছিলেন আমাদের জন্নে এত সুন্দর করে লিখাটা আজ ও মনে হয় চোখে ভাষে । একটা পাখি ছিল সেই ডাইরির পাতায়।  মেম শুধু পথ দেখাতেন আর আমরা সেই পথে দৌড় দিতাম । ক্লাস ৫ এ থাকতে আমাদের দিয়ে সুন্দর সুন্দর কবিতা বলাতেন , আর উনি গান শুনাতেন । উদবট উদ্ভট গল্প শুনাতেন, আমরা হাসতাম , হাঁসতে হাঁসতে পারলে বেঞ্চ থেকে নিচে পড়ে যেতাম । 

ক্লাস ৬ এ উঠলাম , মেম বললেন , এই বার নাটক করবি । এই গল্প আয় রিহাসেল করি । দল বেধে আমরা সারা বছর রিহারসেল করলাম । কোন কিছুই কারো লিখা নাই , মুখে মুখে লাইন , মুখে মুখে গান , মুখে মুখে ছন্দ । আমরা তো করতাম আর হাসতাম আমাদের ক্লাসের প্রত্যেকটা মেয়ে ছেলে তারাও আজ আমার মত বলবে, হাঁ ও এক জন ছিলেন বলে আজ আমরা সবাই এক একজন আলাদা সত্তা । 

ক্লাস ৭ এ উঠলাম । মেম তো পিছন পড়েই আছে । কৈ যাবি তোরা । তোদের আমি ছাড়ছি না । শুরু হল বিতর্ক । কেন জানি এই মহিলা আমার দিকে নজর দিল ! যে আমি বলতে পারিনা সেই ফার্স্ট বক্তা । মেহেদি আর শঞ্ছি ওদের কত হাজার বকা খেয়েছি , ওরা আমাকে বকতে বকতে শেষে আমরা অনেক ট্রপি এনে দিয়েছি । প্রতিটা বিতর্কে আমাদের গাইড দেওয়া , সমসাময়িক কি কি জানতে হবে , কোথায় কোন বইতে কি আছে , সব কিছু এনে দিতেন তিনি । তত দিনে , আমিনুল স্যার, মতিলাল স্যার সহ অনেকে আমাদের হেল্প করতেন , অঞ্জন স্যার ভুলা যায় না স্যার আর বিজ্ঞান ক্লাস আর খোঁচা গুলা । বিতর্ক শেষে সিঙ্গারা আর এমন করে আসে নি স্যার ! 

ক্লাস ৮ । খুব ভয়ানক সময় । হটাত একদিন আমাকে বলেন , বলত খিছুরি কি করে রান্না করে? আমি তো ভাবি আজীবন তো মাই করলো আজ আমি পণ্ডিতি করি । আমি বলি আমার পাশের গুলা আর ও বড় বিশারদ । ওগুলা আরও বড় জান্তা । শেষ মেশ কি যে খিছুরি হইছিল টা আমার জানা নাই । শুধু মনে পড়ে মেম এর হাঁসি আর থামে না। আমরা ভাবছি আমরা তো পেরেই গেছি । মেম তখন আমাদের বুজাতেন কেন আমরা মেয়েরা আলাদা । আমরা কেন গোছানো কিংবা আমাদের গল্প গুলা কেন অন্যদের চেয়ে ভিন্ন । ইডেন কলেজ কে আমাদের মনে গেথে দিয়েছিলেন । বাজে স্বভাব কি করে মানুষ কে নষ্ট করে । অথবা ছবি দেখতে দেখতে উনার বান্ধবি গাল খেয়ে ফেলত । গল্প গুলা আজ ও জেন্ত মনে । আমাদের প্রতিটা বার্ষিক  পরিক্ষার পর অনুষ্ঠান আমরা নিজেরাই সব করতাম । মিলাদ মাহফিল আমরা করতাম, পিকনিক ছিল আর ও মজার দিন । সারাদিন হই হই করা ছবি তুলা , খাওয়া , পাহাড়ে যাওয়া , বন্ধুদের গলায় হাত রেখে ছবি তুলা । বড় আকর্ষণ ছিলেন তিনি নিজে , আমরা উন্মুখ হয়ে থাকতাম তিনি আজ কি সাজ দিয়েছেন ! আজ ও যখন সাজি মনে হয় কোন না কোন ভাবে উনাকেই কপি করি । 

ক্লাস ৯-১০ । আমরা খাঁচায় বন্ধি যত্নে থাকা পাখি । কি বাংলা ১-২ , কিংবা ইংলিশ ১-২ , যে কোন বিষয় মেম কে পাশে পেয়েছি । উনি বলতেন , অঙ্ক আমিনুল স্যার কে দেখাবে , ফিজিক্স , কেমেস্রি যে খানে সমস্যা আমরা আছি । হুজুর স্যার হাত ধরে ধরে লাইন ধরে লিখাও শিখিয়ে দিয়েছেন । কি করে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে একটা প্রসঙ্গ সুন্দর করা যায় তা শিখাতেন , আমাদের যে কোন দিন যে কোন সময় উনার দরজা থাকতো খোলা। আমরা প্রায় সময় বাসায়  যেতাম মেম আমাদের গল্প শুনতেন , আমাদের নতুন নতুন বিষয় গুলাকে মন যোগ দিয়ে সমাধান দিতেন । আমরা মেম কে দেখতাম কত গাছ লাগাতেন। আমরা সে খান থেকে কিছু নিয়ে আসতাম । আমাদের সকল পরিকল্পনায় আগে আমরা রাখতাম মেম কে । আমাদের কবিতা লিখতে বলতেন , আমরা সবাই কবি হয়ে গেলাম । আমাদের যা বলতেন , আমরা তাই করতাম । আমাদের মগজের ভিতর একটা নাম রমা রানী চক্রবর্তী ।

মেম আমাদের প্রত্তেকের নাম জানতেন , সুজুগ পেলে বাসায় আসতেন । আমাদের পরিবারের সবাই উনার ছাত্র ছাত্রি । আমার ছোট বোন তাহ-মিনা উনাকে অনেক ভালবাসে । আমরা যখনি দেখা করি আমরা ফিরে যাই আমাদের শৈশবে আর মেম কে নিয়ে আমাদের কথা চলতেই থাকে । 

জীবনে অনেক কিছু পাওয়ার মধ্যে আমাদের পাওয়া আমাদের বাল্য শিক্ষক আমাদের গুরু আমাদের  মেম রমা রানী চক্রবর্তী। 

No comments:

Post a Comment

Thanks a lot
Regards,
morsalina

রমা

 রমা  আমার বয়স ৩০। গত ৩০ বছরে ৪টা বড় বড় Certificate আছে আমার । আমার অনেক বড় পাওয়া আমার ছাত্র জীবনে রমা মেম কে পাওয়া। ক্লাস ৪ থেকে তিনি আমাদে...